২১ নভেম্বর, ২০২১ ০২:১৯ পিএম

সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় বাধা রোগীর পকেট থেকে উচ্চব্যয় 

সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় বাধা রোগীর পকেট থেকে উচ্চব্যয় 
প্রবন্ধে উঠে এসেছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মাত্র ৩ শতাংশ রোগী ওষুধ এবং ১৪.৯ শতাংশ রোগী পরীক্ষা-নিরীক্ষা পেয়ে থাকেন।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে রোগীর নিজ পকেট থেকে ব্যয়ের প্রধান উৎস হলো ওষুধ খাতে ব্যয়, যা প্রায় ৬৪ ভাগ। আর উচ্চহারে রোগীর পকেট থেকে ব্যয় সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে প্রধান অন্তরায়। গ্রামপর্যায়ে বিস্তৃত সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যথাযথ কার্যকর না হওয়া এবং শহর এলাকায় পর্যাপ্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা না থাকায় রোগী বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা গ্রহণে বাধ্য হন। তাছাড়া সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ ওষুধ দেওয়া হয় না এবং রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগও থাকে না। ফলে এ ব্যয় ক্রমাগতভাবেই বাড়ছে। 

আজ রোববার (২১ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক কর্মশালায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

এতে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ।

প্রবন্ধে উঠে এসেছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মাত্র তিন শতাংশ রোগী ওষুধ এবং ১৪.৯ শতাংশ রোগী পরীক্ষা-নিরীক্ষা পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবাগ্রহণকারী অধিকাংশ রোগীকে ফার্মেসি থেকে ওষুধ ক্রয় এবং ডায়াগনোস্টিক ল্যাব থেকে সেবাগ্রহণ করতে হয়। ফলে রোগীর ব্যয় বেড়ে যায় এবং প্রায়ই রোগী আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন।

এতে বলা হয়, প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশে ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতির ফলে সূচকে দেখা গেছে অভাবনীয় সাফল্য, মিলেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু তৃতীয় ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে বাংলাদেশ বহুদূর পিছিয়ে রয়েছে। 

২০১২ সালে বাংলাদেশে রোগীর নিজ পকেট থেকে ব্যয় ছিল ৬৪ ভাগ, যা ২০৩২ এর মধ্যে তা ৩২ ভাগে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশল: ২০১২-২০৩২ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু ২০১৫ সালে এ খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ ভাগ। তাই বলা চলে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে বাংলাদেশের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে উচ্চহারে রোগীর পকেট থেকে ব্যয়।

প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, রোগীর নিজ পকেট থেকে ব্যয়ের প্রধান উৎস হলো ওষুধ খাতে ব্যয়, যা প্রায় ৬৪ ভাগ। হাসপাতালে আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগ থেকে সেবা নেওয়ার মাধ্যমে যথাক্রমে ১২ ও ১১ ভাগ ব্যয় হয়। এছাড়া রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা খাতে ব্যয় হয় ৮ ভাগ। গ্রামপর্যায়ে বিস্তৃত সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যথাযথ কার্যকর না হওয়ায় এবং শহর এলাকায় পর্যাপ্ত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা না থাকায় রোগী বেসরকারি হাসপাতাল থেকে গ্রাম পর্যায়ে বাধ্য হন। তাছাড়া সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবাগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ ওষুধ দেওয়া হয় না এবং রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগও থাকে না।

ড. মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ জানান, ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এন্টিবায়োটিকসহ প্রায় সব ধরনের ওষুধ ক্রয়ের সুযোগ থাকায় এবং ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বিপণনের ফলে স্বীকৃত ডাক্তারদের পাশাপাশি পল্লী ও হাতুড়ে ডাক্তাররাও ব্যবস্থাপত্রে অতিমাত্রায় ওষুধ লিখে থাকেন। এর প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ সেবন করা হয় এবং একজন রোগীর ব্যয় বেড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল অ্যাক্রিডিটেশন পদ্ধতি না থাকা এবং সেবা মান ও মূল্যের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকায় সেবাগ্রহণকারী জনগণ প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেবা বিষয়ে রোগীদের অসন্তুষ্টি ও কখনও কখনও আস্থার ঘাটতি তাদের দেশের পরিবর্তে বিদেশ থেকে সেবাগ্রহণে উৎসাহিত করে। এভাবে চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক মানুষ ভিটে-জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।

তবে জরুরি ওষুধের তালিকা সংশোধন ও সম্প্রসারণ এবং ব্যবস্থাপত্রে প্রটোকল অনুসরণ করে কোম্পানির ওষুধের ‘ব্র্যান্ড নাম ব্যবহারের পরিবর্তে’ জেনেরিক নাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলে এ ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা খাতের যোগানের দিক শক্তিশালী করার পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে) বা সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা চালু ও সম্প্রসারণের মাধ্যমেও রোগীর নিজ পকেট থেকে ব্যয় কমানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

এতে আরও জানানো হয়, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা’ অর্থ কোন প্রকার আর্থিক দূরবস্থায় পতিত না হয়ে সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন তার প্রয়োজন। অনুযায়ী মানসম্মত স্বাস্থসেবা গ্রহণ করতে পারেন তা নিশ্চিত করা। এর তিনটি ডাইমেনশন বা দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো, স্বাস্থ্য সেবা প্রতিটি মানুষের নিকট পৌছে দেওয়া (Population Coverage), দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত স্বাস্থসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা (Service Coverage) এবং তৃতীয়টি হলো স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণের কারণে সৃষ্ট আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা (Financial Risk Protection)। প্রথম দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই এগিয়ে গেছে। প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেবার জন্যে দেশে ১৪,০০০ এর বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্য সেবায় উন্নতির ফলে সূচকে দেখা গেছে অভাবনীয় সাফল্য, মিলেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু তৃতীয় ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে বাংলাদেশ বহুদূর পিছিয়ে রয়েছে। 

২০১২ সালে বাংলাদেশে রোগীর নিজ পকেট হতে ব্যয় (Out-Of-Pocket expenditure-OOP) ছিল ৬৪ ভাগ, যা ২০৩২ এর মধ্যে ৩২ ভাগে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য সেবা অর্থায়ন কৌশল: ২০১২-২০৩২ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু ২০১৫ সালে এই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ ভাগ। তাই বলা চলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা অর্জনে বাংলাদেশের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে উচ্চ OOP। 

এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় “Pathways to reduce Household out-of-pocket Expenditure” শীষক টেকনিক্যাল রিপোর্ট তৈরি করেছে, যার অবহিতকরণ কর্মশালা ২১ নভেম্বর ২০২১ তারিখ ঢাকার হোটেল ইন্টাকন্টিনেন্টাল এ অনুষ্ঠিত হয়। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. লোকমান হোসেন মিয়া, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু প্রমুখ।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক